ভয়েস এশিয়ান, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬।। পাথর আর বালিতে ঘেরা অনুর্বর এক ছোট্ট দ্বীপ। বাইরে থেকে দেখলে তেমন কোনো গুরুত্বই নেই। কিন্তু ইয়েমেনের উপকূলের কাছে অবস্থিত পেরিম দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে দিয়েছে অসাধারণ কৌশলগত গুরুত্ব।
লোহিতসাগর ও ভারত মহাসাগরের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির মাঝখানে অবস্থান করায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে দ্বীপটি।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পেরিম ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি বিভিন্ন সাম্রাজ্য ও আঞ্চলিক শক্তির কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতে যাতায়াতকারী জাহাজে কয়লা সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবেও পেরিম ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হিসেবে দ্বীপটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
হুতিদের নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা
পেরিমকে ঘিরে বর্তমান উদ্বেগের অন্যতম কারণ ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা এই গোষ্ঠী দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর চাপ সৃষ্টির সক্ষমতা অনেকটাই বাড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালির বিকল্প গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে এই প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন নির্বিঘ্ন রাখা এখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম বিষয়।
পেরিমের প্রায় ৫০ মাইল উত্তরে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা ইতিমধ্যে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে পেরিমের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। ইয়েমেন সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তারিক সালেহ সতর্ক করে বলেছেন, হুতিরা পেরিম দখল করলে তাদের সরাতে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সামরিক ও নৌবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন হতে পারে।
গৃহযুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বে
ইয়েমেনের বর্তমান সংকটের শুরু ২০১৪ সালে। সে বছর হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে। পরের বছর হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি আরব। দীর্ঘ এই সংঘাতে ইরান হুতিদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গাজা যুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। হুতিরা ইসরায়েল ও লোহিতসাগর দিয়ে চলাচলকারী বিভিন্ন জাহাজে হামলা শুরু করে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল-বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচল করলেও হামলা ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে সেই পরিমাণ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
জাহাজ চলাচলে বাড়ছে ঝুঁকি
হুতিদের হামলার প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মোখা বন্দরে রকেট হামলায় বাণিজ্যিক জাহাজসহ বিভিন্ন সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্দর কর্মকর্তাদের দাবি, একটি হামলায় ১৬ জন নিহত ও ২২ জন আহত হন এবং ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবে যায়।
ইয়েমেন সরকার অভিযোগ করেছে, ইরান হুতিদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার ব্যবস্থা, ড্রোন প্রযুক্তি ও অন্যান্য আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করছে। পেরিমের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে গেলে বাব আল-মান্দেবে জাহাজ চলাচল আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।
এমনকি প্রণালিতে মাইন পেতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
ছোট দ্বীপ, বড় ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ এখন আর শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়। বাব আল-মান্দেবকে ঘিরে সংঘাতের প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেও পড়ছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবেও যদি জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়, তাহলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। আর সেই কারণেই অনুর্বর ও ছোট্ট পেরিম দ্বীপটি ক্রমেই হয়ে উঠছে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ এক কৌশলগত বিন্দু।