ভয়েস এশিয়ান, ০৬ অক্টোবর, ২০২৬।। ইয়েমেনের হুথিদের হামলা মোকাবিলা এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা জোরদারে নতুন সামরিক সমীকরণ সামনে এসেছে। গত আগস্টে স্বাক্ষরিত সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যকার ‘মক্কা চুক্তি’ এখন কার্যকর হয়েছে। এর আওতায় সৌদি আরবে পাকিস্তানি ও তুর্কি বাহিনী দ্রুত মোতায়েনের বিষয়ে সম্মত হয়েছে সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কমিটি।
সোমবার রিয়াদে অনুষ্ঠিত এক জরুরি বৈঠকে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, যৌথ প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে অবিলম্বে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জাতীয় আইন ও অনুমোদিত ব্যবস্থার আওতায় প্রয়োজনীয় সামরিক বাহিনী ও সক্ষমতা সৌদি আরবে দ্রুত মোতায়েনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে সৌদি আরবে কতসংখ্যক সেনা মোতায়েন করা হবে কিংবা তাদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব কী হবে—এ বিষয়ে যৌথ বিবৃতিতে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
পাকিস্তানের ভূমিকা কতটা?
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি জানিয়েছেন, গত মাসে হুথিদের দখলে যাওয়া এলাকা পুনরুদ্ধারে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর পাল্টা অভিযানে সহায়তার জন্য ১০০টি যুদ্ধবিমান নিয়োজিত রয়েছে।
এর কয়েক ঘণ্টা পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানান, পাকিস্তানি বাহিনী ইতোমধ্যে এই প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখছে।
সোমবার রাতে রিয়াদ থেকে জিও নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের বাহিনী সহায়তাকারী ভূমিকা পালন করছে। গোয়েন্দা নজরদারি ও এ ধরনের কার্যক্রমে পাকিস্তান যুক্ত থাকলেও মূল যুদ্ধ পরিচালনা করছে সৌদি বাহিনী।
এতে আপাতত সৌদি অভিযানে পাকিস্তানের ভূমিকা সরাসরি আক্রমণাত্মক না হয়ে প্রতিরক্ষামূলক ও সহায়ক পর্যায়ে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
সৌদিতে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি নতুন নয়
সৌদি আরবে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। ১৯৬৭ সাল থেকেই পাকিস্তানি সামরিক সদস্যরা সৌদি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন। ১৯৮২ সালের একটি চুক্তির মাধ্যমে দেশটিতে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের বিষয়টিও আনুষ্ঠানিক রূপ পায়।
১৯৮৫ সালের অবমুক্ত করা একটি সিআইএ নথি অনুযায়ী, সে সময় সৌদি সেনাবাহিনীতে ১৩ থেকে ১৪ হাজার পাকিস্তানি সদস্য কর্মরত ছিলেন। ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ও পাকিস্তান সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় বড় আকারের সামরিক দল পাঠিয়েছিল।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। ওই চুক্তির আওতায় এক দেশের ওপর আগ্রাসনকে উভয় দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়।
সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর গণমাধ্যম শাখা আইএসপিআরের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরীও জানিয়েছিলেন, সৌদি আরব ও পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষায় পাকিস্তানি বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।
প্রতিরক্ষা নাকি ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধ?
‘মক্কা চুক্তি’ কার্যকরের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—পাকিস্তান ও তুরস্কের সেনারা কি শুধু সৌদি ভূখণ্ড রক্ষা করবে, নাকি ইয়েমেনের অভ্যন্তরেও সামরিক অভিযানে যুক্ত হবে?
গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক ডানিয়া থাফেরের মতে, রিয়াদ চুক্তিটিকে কেবল রাজনৈতিক ঘোষণা হিসেবে রাখতে চায় না; বরং কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে।
তার মতে, সৌদি আরব আপাতত পাকিস্তান ও তুরস্কের সহায়তায় নিজেদের ভূখণ্ড, আকাশ প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে চাইছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এর আগে স্পষ্ট করেছেন, চুক্তিটির প্রকৃতি মূলত আত্মরক্ষামূলক এবং এর কোনো আক্রমণাত্মক উদ্দেশ্য নেই।
পাকিস্তানের ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার তুঘরল ইয়ামিনের মতে, পাকিস্তানের ভূমিকা সম্ভবত আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট, ড্রোন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সাইবার সক্ষমতা, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট ও বিশেষ বাহিনীর সীমিত মোতায়েনের মধ্যে থাকতে পারে।
তুরস্কের ভূমিকা এখনও অস্পষ্ট
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সৌদিতে তুর্কি বাহিনীর উপস্থিতির কথা বললেও আঙ্কারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সেনা মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
ইস্তাম্বুলের ইবন খালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ গোকহান এরেলির মতে, সৌদি আরবে তুরস্কের স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি প্রকাশ্যে স্বীকার করা হয়নি। তুরস্কের সংবিধান অনুযায়ী বিদেশে সেনা পাঠানোর ক্ষেত্রে সংসদের অনুমোদনের প্রয়োজন হয় এবং ‘মক্কা চুক্তি’ এখনও সংসদে অনুমোদিত হয়নি।
ইয়েমেনে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা
চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের বড় উদ্বেগ হলো, সৌদি প্রতিরক্ষার নামে শুরু হওয়া এই ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাকিস্তান ও তুরস্ককে কতটা টেনে নেবে।
ডানিয়া থাফেরের মতে, বর্তমানে দুটি সমান্তরাল লক্ষ্য দেখা যাচ্ছে—একটি সৌদি আরবকে রক্ষা করা এবং অন্যটি ইয়েমেনের সামরিক ভারসাম্য পরিবর্তন করে হুথিদের সৌদি ভূখণ্ডে হামলার সক্ষমতা কমানো।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফও সরাসরি ইয়েমেনে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলায় অংশগ্রহণের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেননি। তবে তিনি বলেছেন, সৌদি আরবকে রক্ষার প্রতিশ্রুতির আওতায় পাকিস্তানের হাতে থাকা সক্ষমতা প্রয়োজনে কাজে লাগানো হবে।
ইরানের সতর্কবার্তা
বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইরানও। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই আশা প্রকাশ করেছেন, ইয়েমেন যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের খবর যেন সত্য না হয়। তার মতে, নতুন কোনো সামরিক হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ইরানি বিশ্লেষক জাভেদ হেইরান-নিয়ার মতে, পাকিস্তানি বাহিনী যদি কেবল সৌদি স্থাপনা ও ভূখণ্ড রক্ষায় নিয়োজিত থাকে, তাহলে তেহরান সেটিকে একভাবে দেখবে। কিন্তু পাকিস্তান যদি হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ নেয়, তাহলে সেটিকে ইরান গুরুতর সীমালঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
সামনে বড় প্রশ্ন
২০১৫ সালের ইয়েমেন যুদ্ধের সময়ও পাকিস্তানের সামনে একই ধরনের সিদ্ধান্তের প্রশ্ন এসেছিল। সে সময় দেশটির পার্লামেন্ট ইয়েমেন সংঘাতে নিরপেক্ষ থাকার পক্ষে অবস্থান নেয়। তবে একই সঙ্গে সৌদি আরবের ভূখণ্ড বা পবিত্র স্থান হুমকির মুখে পড়লে দেশটির পাশে থাকার কথাও বলা হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পুরোনো নীতিই নতুন করে সামনে এসেছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে পাকিস্তান কতদূর যাবে এবং ইয়েমেনে চলমান সামরিক অভিযানে তারা সরাসরি জড়িয়ে পড়বে কি না—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে ‘মক্কা চুক্তি’ কার্যকর হওয়ার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক সহযোগিতা যে নতুন মাত্রা পেয়েছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আল জাজিরা