ভয়েস এশিয়ান, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬।। বিশ্বে প্রতিবছর শতকোটি টনের বেশি খাবার অপচয় হচ্ছে। বাংলাদেশেও উৎপাদিত খাদ্যের বড় একটি অংশ মাঠ থেকে বাজার কিংবা ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতে হারিয়ে যাচ্ছে।
ফলে ডিসেম্বরে দেশে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষের তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। উৎপাদনের ঘাটতির চেয়ে তাই বাংলাদেশের সামনে বড় হয়ে উঠছে খাদ্যের দাম, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থা এবং অপচয়ের প্রশ্ন।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের বড় অর্জনগুলোর একটি খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টন। পাঁচ দশক পর তা পাঁচ কোটি টনের সীমা ছাড়িয়েছে। ধান, ভুট্টা, আলু, সবজি ও মাছসহ বেশ কয়েকটি খাদ্যপণ্যের উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর একটি।
২০২৬ সালেও ধানের উৎপাদন পরিস্থিতি মোটের ওপর ইতিবাচক। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, এ বছরের বোরো ধানের উৎপাদন প্রায় ৩ কোটি ১৯ লাখ টন এবং আউশ প্রায় ৪১ লাখ টন। সামগ্রিক উৎপাদনকে সংস্থাটি গড়ের চেয়ে ভালো বলছে।
কিন্তু একই সময়ে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পূর্বাভাস বলছে, সেপ্টেম্বর থেকে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ‘সংকট’ বা তার চেয়েও খারাপ পর্যায়ে থাকতে পারেন। এর মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ ‘জরুরি’ পর্যায়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মে-আগস্ট সময়ে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ।
অর্থাৎ খাদ্য উৎপাদন মোটামুটি ভালো হলেও মানুষের বড় একটি অংশের জন্য খাবার নিশ্চিত হচ্ছে না। দীর্ঘ সময়ের মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা।
বিশ্বেও একই বৈপরীত্য
সমস্যাটি শুধু বাংলাদেশের নয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ‘বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার শিকার ছিলেন। মাঝারি থেকে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ছিলেন প্রায় ২১০ কোটি মানুষ।
অন্যদিকে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির ‘খাদ্য অপচয় সূচক প্রতিবেদন’ অনুযায়ী, ২০২২ সালে শুধু বাসাবাড়ি, খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও খুচরা বিক্রয় পর্যায়ে ১০৫ কোটি টন খাদ্য নষ্ট হয়েছে, যা ভোক্তার জন্য উপলভ্য মোট খাদ্যের প্রায় ১৯ শতাংশ। শুধু বাসাবাড়িতেই প্রতিদিন ১০০ কোটির বেশি বেলার সমপরিমাণ খাবার অপচয় হয়।
এই অপচয়ের প্রভাব শুধু ক্ষুধায় সীমাবদ্ধ নয়। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির হিসাবে, খাদ্যক্ষয় ও অপচয় বৈশ্বিক তাপধারণকারী গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশের জন্য দায়ী। বছরে এর অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় এক লাখ কোটি ডলার।
বাংলাদেশের ক্ষতি কোথায়
বাংলাদেশে খাদ্যক্ষয় সরবরাহব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি ধাপে ঘটে। ধান কাটা ও মাড়াইয়ের সময় ক্ষতি হয়। ফল ও সবজি সংগ্রহের পর সঠিকভাবে বাছাই, মোড়কজাতকরণ ও ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা না থাকায় নষ্ট হয়। পরিবহনের সময় চাপ ও তাপমাত্রার কারণে ক্ষতি হয়, আবার বাজারে উপযুক্ত সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় খাদ্যের আরেকটি অংশ নষ্ট হয়।
ভোক্তা পর্যায়েও অতিরিক্ত কেনাকাটা, বেশি রান্না, বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার পরিবেশন এবং অবশিষ্ট খাবার পুনর্বণ্টনের সংগঠিত ব্যবস্থা না থাকায় অপচয় বাড়ে।
বিভিন্ন গবেষণায় ক্ষতির হার ভিন্ন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে আয়োজিত এক আলোচনায় উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত খাদ্যক্ষয় ও অপচয়ের হার প্রায় ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ এবং পরিমাণ বছরে প্রায় ২ কোটি ১১ লাখ টন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, বাংলাদেশের উৎপাদিত খাদ্যের এক-তৃতীয়াংশের বেশি কোনো না কোনো পর্যায়ে হারিয়ে যায় বা অপচয় হয়। এর অর্থনৈতিক মূল্য দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের ৪ শতাংশেরও বেশি।
ফল ও সবজির ক্ষেত্রে সমস্যা আরও প্রকট। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির বাংলাদেশ কার্যালয়ের উপস্থাপিত বিভিন্ন গবেষণার হিসাবে, ধানের ৮ থেকে ১৫ শতাংশ এবং ফল ও সবজির প্রায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন-পরবর্তী পর্যায়ে হারাতে পারে।
খাবারের সঙ্গে সম্পদও নষ্ট
এক কেজি খাদ্য নষ্ট হওয়ার অর্থ শুধু সেই খাবারটি হারানো নয়। এর পেছনে ব্যবহৃত জমি, পানি, সার, বিদ্যুৎ, শ্রম, পরিবহন ও জ্বালানিও কার্যত অপচয় হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশে যে খাদ্য শেষ পর্যন্ত খাওয়া হয় না, তা উৎপাদনে দেশের কৃষিজমির প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমপরিমাণ সম্পদ ব্যবহৃত হয়। খাদ্যক্ষয় ও অপচয় দেশের তাপধারণকারী গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ১৩ শতাংশের সঙ্গেও যুক্ত।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন ২০২৫ সালে এক নীতি সংলাপে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশের মতো দেশে খাদ্য নষ্ট হওয়া মানে সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদেরও অপচয়। ফলে খাদ্যক্ষয় কমানোর বিষয়টি খাদ্যনীতির পাশাপাশি পরিবেশ ও জলবায়ু নীতির অংশ হওয়া প্রয়োজন।
শীতল সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থায় বড় ঘাটতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বড় দুর্বলতাগুলোর একটি শীতল সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থার অভাব। দেশে শত শত হিমাগার থাকলেও সেগুলোর বড় অংশ আলু সংরক্ষণকেন্দ্রিক। মাছ, দুধ, ফল ও বিভিন্ন সবজির জন্য প্রয়োজনীয় আলাদা তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা এখনো সীমিত।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফসল-পরবর্তী প্রযুক্তি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হাফিজুল হক খান বলেছেন, ফল ও সবজির মতো বেশি পানিযুক্ত পণ্য দ্রুত নষ্ট হয়। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পরিকল্পিত সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থার ঘাটতিই এখানে বড় সমস্যা।
বিশ্বব্যাংকের কৃষি বিশেষজ্ঞরা প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, দুর্যোগের আগাম সতর্কতা, উন্নত পণ্য ব্যবস্থাপনা, আধুনিক বাজার এবং সমন্বিত শীতল সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থা তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে সমাধান শুধু বড় অবকাঠামো নয়। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত বাংলাদেশের ৪১১ জন বেগুন ও বাঁধাকপি চাষিকে নিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিষ্কার করা, ঠান্ডা রাখা, সংরক্ষণ ও উন্নত মোড়কজাতকরণের মতো কম খরচের ফসল-পরবর্তী প্রশিক্ষণও কৃষকের প্রযুক্তি ব্যবহার ও আয় বাড়াতে পারে।
উৎপাদন নয়, প্রবেশাধিকারও গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, দেশে যথেষ্ট খাবার উৎপাদিত হওয়া মানেই সবার খাবার নিশ্চিত হওয়া নয়। খাদ্য নিরাপত্তা নির্ভর করে প্রাপ্যতার পাশাপাশি মানুষের কেনার সামর্থ্য, পুষ্টিগুণ এবং নিয়মিত খাবার পাওয়ার নিশ্চয়তার ওপর।
তাই বাংলাদেশের সমস্যা শুধু আরও বেশি ধান বা সবজি ফলানোর নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, দুর্যোগ সহনশীল কৃষি এবং কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা একই সমীকরণের অংশ।
সমাধানের ক্ষেত্রে প্রথম প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার, যাতে কোন পণ্য কোন পর্যায়ে কতটা নষ্ট হচ্ছে তা স্পষ্টভাবে জানা যায়। পাশাপাশি ফল, সবজি, মাছ ও দুধের জন্য অঞ্চলভিত্তিক শীতল সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থা, আধুনিক বাছাই ও মোড়কজাতকরণ কেন্দ্র এবং উন্নত পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ক্ষুদ্র কৃষকের কাছে কম খরচের সংরক্ষণ, শুকানো, মোড়কজাতকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি পৌঁছানো, উৎপাদন এলাকা ও বাজারের মধ্যে তথ্যের ব্যবধান কমানো এবং হোটেল, রেস্তোরাঁ ও সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে উদ্বৃত্ত নিরাপদ খাবার পুনর্বণ্টনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও প্রয়োজন।