ভয়েস এশিয়ান, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬।। তথ্যপ্রযুক্তির এই বিপ্লবের যুগে এখনো দেশের বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠি ডিজিটাল সুবিধার বাইরে রয়ে গেছেন। যাদের বেশিরভাগই নিম্ন আয়ের। ডিজিটাল রূপান্তরের এই যুগে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে না নিয়ে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই ডিজিটাল এই বৈষম্য ঘোচাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকার কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, দিনমজুর-খেটেখাওয়া ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হাতে তথ্যপ্রযুক্তির সুফল পৌঁছে দিতে এক যুগান্তকারী উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী অক্টোবর মাস থেকেই দেশীয় কারখানায় তৈরি সাশ্রয়ী মূল্যের স্মার্টফোন বাজারে উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। যেখানে বর্তমানে একটি সাধারণ স্মার্টফোন কিনতে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা গুনতে হয়, সেখানে মাত্র ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে আধুনিক ডেটা ও ভয়েস-সুবিধাসম্পন্ন ডিভাইস সাধারণ মানুষের নাগালে আনার প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত। সরকারের লক্ষ্যÑআগামী ১৮ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে ডিজিটাল সেবার বাইরে থাকা ৭ কোটি মানুষকে উচ্চগতির ইন্টারনেট ও ডেটা সংযোগের আওতায় এনে দেশজুড়ে শতভাগ নেটওয়ার্ক কভারেজ নিশ্চিত করা। সাশ্রয়ী দাম, সহজ কিস্তি সুবিধা এবং প্রান্তিক মানুষের ব্যবহার উপযোগী করে তৈরি এই স্মার্টফোন ডিজিটাল সুবিধার বাইরে থাকা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনমান, উৎপাদনশীলতা ও জীবিকায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলেই সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার, বিটিআরসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, মোবাইল অপারেটর এবং স্থানীয় হ্যান্ডসেট সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্যোগে নি¤œআয়ের মানুষের হাতে স্বল্পমূল্যে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার কাজ চলছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে চলতি সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই দেশে সংযোজিত প্রথম ডিভাইসের নমুনা উন্মোচন করা হতে পারে। পরবর্তীতে অক্টোবরের মাঝামাঝি নাগাদ দেশব্যাপী পরিবেশক ও ডিলারদের মাধ্যমে বড় পরিসরে এই সাশ্রয়ী স্মার্টফোন সাধারণ গ্রাহকদের হাতে তুলে দেওয়ার কাজ শুরু হবে।
প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, আমরা দেশের ৭ কোটি মানুষ যারা এখনো ডেটার (ডিজিটাল সেবা) মধ্যে নেই, তাদেরকে ডেটায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। আমরা দেশের শহর, বন্দর, প্রান্ত সবখানে ৫জি ডেটা সার্ভিস পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি এবং ডিভাইসকে সহজলভ্য করে সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সমাজের সকলের দিকে খেয়াল রাখা এবং সকলের কাছে সার্ভিস পৌঁছে দেওয়া। দেশের যে শ্রেণীর মানুষের কাছে হয়তো এই মূল্যটাও চ্যালেঞ্জিং, সেই শ্রেণীর জন্য প্রয়োজন হলে আমরা সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার যে ফান্ড রয়েছে সেটা ব্যবহার করা হবে। আমরা সেখান থেকে সাবসিডি দিয়ে এই ফোনটাকে আরও সহজলভ্য করা যায় কি করে, কিংবা এটা কারেন্ট প্রাইস রেঞ্জেই আমরা কি করে এনে বিক্রি করতে পারি, প্রয়োজন হলে আমরা সেটাও করতে প্রস্তুত আছি।
উপদেষ্টা আরও জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক মোবাইল ফোন কেনার ক্ষেত্রে ইএমআই সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে আগের বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে। এর ফলে এখন যেকোনো ব্যাংক মোবাইল ফোন কেনার জন্য গ্রাহকদের ইএমআই সুবিধা দিতে পারবে।
রেহান আসিফ আসাদ বলেন, সরকার একা এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারবে না। এ কারণে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী, মোবাইল অপারেটর এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে তাদের নিজ নিজ ভূমিকা পালনের জন্য সম্পৃক্ত করা হয়েছে। তিনি জানান, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত প্রথম ফোনটি শিগগিরই বাজারে পাওয়া যেতে পারে। আর ডিলারদের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ স্থানীয় উৎপাদন অক্টোবরের মাঝামাঝি নাগাদ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ কোটি মোবাইল সংযোগ চালু থাকলেও গ্রাহকদের একটি বিশাল অংশ তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিক সেবা থেকে বঞ্চিত। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ এখনো টুজি বা সাধারণ ভয়েস নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রায় ৭ কোটি গ্রাহক ফিচার ফোন (বাটন ফোন) ব্যবহার করছেন। ফলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রাপ্ত আধুনিক নাগরিক সেবা, কৃষি ও স্বাস্থ্য তথ্য এবং ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এই বিশাল জনগোষ্ঠী।
সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি সাধারণ স্মার্টফোনের উৎপাদন ব্যয় হয় ডিসপ্লে ও প্রসেসরে। ১৭ মার্কিন ডলার মূল্যের এলসিডি স্ক্রিন ব্যবহার হয়, মাদরাবোর্ড, প্রসেসর এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩ ডলার, ব্যাটারি এবং কেসিংয়ের পেছনে খরচ ধরা ১৫ থেকে ১৬ ডলার। সব মিলিয়ে একটি হ্যান্ডসেট তৈরিতে মোট উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৫৫ মার্কিন ডলারে। স্থানীয় উৎপাদকদের সঙ্গে সরকারের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিটি ডিভাইসে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদনে কর অব্যাহতি এবং বাজেটে ঘোষিত ঋণসুবিধা সমন্বয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত খুচরা মূল্য সাড়ে ৫ হাজার টাকার মধ্যে রাখা সম্ভব হচ্ছে।
ব্ল্যাকবেরি আদলে নকশা: দুই-তৃতীয়াংশ টাচস্ক্রিন ও ফিজিক্যাল কিবোর্ড
স্মার্টফোনটির নকশায় আনা হয়েছে চমকপ্রদ ও বাস্তবমুখী পরিবর্তন। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও ব্যবহারের অভ্যাসের কথা বিবেচনায় নিয়ে ডিভাইসটির আধুনিক রূপ দেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ এলাকার অনেক ব্যবহারকারী এখনো টাচ স্ক্রিনের চেয়ে বাটন ফোনেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এছাড়া ১৮ থেকে ২০ ডলার মূল্যের ফুল-স্ক্রিন এলসিডি ব্যবহারের কারণে ফোনের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়। এ সমস্যার সমাধানে দেশীয় গবেষক ও মোবাইল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ঐতিহাসিক ‘ব্ল্যাকবেরি’ বা ‘পাম’ ফোনের ধারণাকে আধুনিকায়ন করেছেন। নতুন এই ফোনের উপরের অংশে দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) থাকছে টাচস্ক্রিন ডিসপ্লে এবং নিচের এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) অংশে থাকছে ফিজিক্যাল কিবোর্ড। এই কিবোর্ডে ইংরেজি অক্ষরের পাশাপাশি বাংলা বর্ণমালা যুক্ত থাকবে, যা গ্রামীণ মানুষের জন্য টাইপ করা ও অ্যাপস চালানো সহজ করে তুলবে।
বান্ডেল, ইএমআই সুবিধা ও এসওএফ তহবিল
সাড়ে ৫ হাজার টাকায় হ্যান্ডসেট প্রাপ্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রান্তিক গ্রাহকের ওপর আর্থিক চাপ কমাতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। মোবাইল অপারেটরের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের অংশ হিসেবে হ্যান্ডসেটের সঙ্গে বিনামূল্যে তিন মাসের উচ্চগতির ডেটা ও ভয়েস কল বান্ডেল প্যাক দেওয়া হবে। এতে করে ডিভাইসটি কেনার পর গ্রাহকের প্রাথমিক খরচ অনেকাংশে সমন্বয় হবে এবং ফোনটির বাস্তবিক খচর ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকায় নেমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি আগে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ইলেকট্রনিকস পণ্যে সহজ কিস্তি সুবিধা দিলেও মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু বিধিনিষেধ ছিল। বর্তমান সরকারের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ফলে এখন যে কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বল্প সুদে বা সুদবিহীন মাসিক কিস্তিতে গ্রাহকরা এই স্মার্টফোন কেনার সুযোগ পাবেন। এছাড়া অতি-দরিদ্র জনগোষ্ঠির (প্রায় ২ কোটি) জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর অধীনে পরিচালিত ‘সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল’ বা সার্ভিস অবলিগেশন ফান্ডে (এসওএফ) বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা রয়েছে সেটি ব্যবহারেরও পরিকল্পনা রয়েছে। উপদেষ্টা জানান, জনগণের টাকায় গঠিত এই সামাজিক কল্যাণ তহবিল থেকে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ভর্তুকি দিয়ে অতি-দরিদ্র ও প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের কাছে বিনামূল্যে অথবা নামমাত্র মূল্যে এই স্মার্টফোন সরবরাহ করা হবে। এর ফলে সমাজের সর্বস্তরে সমান ডিজিটাল অধিকার নিশ্চিত হবে।
মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স এসোসিয়শেন অব বাংলাদেশ (এমআইওবি) এর সভাপতি বলেন, সাধারণ মানুষ যাতে ডিজিটাল কানেক্টিভিটিতে থাকে এজন্যই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এই ফোনে একইসাথে বাটন দিয়ে সাধারণ সেবা পাবেন গ্রাহকরা এবং হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো অ্যাপসও ব্যবহার করতে পারবে। তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে এই মডেলটিই প্রস্তুত করা হচ্ছে, পরবর্তীতে এটি আরো আপগ্রেড করা হবে।