ভয়েস এশিয়ান, ০৩ জুলাই, ২০২৬।। বিশ্ব জুড়ে দক্ষ কর্মীর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। জনসংখ্যা কমে যাওয়া, বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিল্প খাতের সম্প্রসারণের কারণে অনেক দেশ বিদেশি কর্মী নিতে বাধ্য হচ্ছে। যা হুমড়ি খেয়ে লুফে নিচ্ছে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো। তারা আগ্রাসী অর্থনৈতিক কূটনীতি চালিয়ে বিভিন্ন দেশে নিজেদের শ্রমিকদের একটা ব্র্যান্ড তৈরি করছে। তাদের রাষ্ট্রদূতরা শুধু আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেননি, নতুন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান খুঁজেছেন, শ্রম চুক্তি করেছেন, দক্ষ জনশক্তিকে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন।
- সুযোগ নিচ্ছে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের মতো দেশ
- বাড়ছে মানব পাচার
- ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বছরে অন্তত ৫০০ বাংলাদেশি মারা যান
- গত বছরের মার্চ পর্যন্ত মানব পাচার আইনে ৪,৪৪৮টি মামলা করা হয়েছে
কিন্তু এ পথে বাংলাদেশ যেন এক পথহারা পথিক, হাঁটছে উল্টো পথে। তাই বিদেশের শ্রমবাজার ধরার প্রতিযোগিতায় নেপালের মতো দেশের সঙ্গেও পেরে উঠছে বিশাল জনশক্তির এ দেশ। বাংলাদেশে বৈধপথে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ যত কমছে, দালালদের ব্যবসা তত ফুলেফেঁপে উঠছে। সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একটি বিশাল প্রতারণার বাজার। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সংকট দেশের ভেতরে নয়; শুরু হয়েছে দেশের বাইরে থেকেই। যেখানে বাংলাদেশের দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলো নতুন শ্রমবাজার তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ।

এ ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ জাপান। দীর্ঘদিন ধরে জনসংখ্যা সংকটে থাকা দেশটিতে এখন নার্সিং, কেয়ারগিভার, কৃষি, নির্মাণ, অটোমোবাইলসহ বিভিন্ন খাতে হাজার হাজার কর্মীর প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে নেপাল থেকে জাপানে গেছে ৫৬ হাজার ৭০৭ জন কর্মী। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে গেছে মাত্র ৩ হাজার ৫৭৪ জন। এই সংখ্যার মধ্যে আবার শিক্ষার্থী, পর্যটক এবং অন্যান্য ভিসাধারীরাও অন্তর্ভুক্ত।
আরও হতাশাজনক তথ্য দিয়েছে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। সংস্থাটির হিসাবে ২০১৯-২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে জাপানে গেছে মাত্র ১ হাজার ৮৪৯ জন বাংলাদেশি কর্মী। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে গেছে মাত্র পাঁচজন। অথচ বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩০ হাজারের বেশি নার্স, সাড়ে ছয় থেকে আট হাজার চিকিৎসক, ৯ থেকে ১১ হাজার মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ৩৫ হাজারের বেশি বিএসসি প্রকৌশলী, এক লাখের বেশি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী এবং হাজার হাজার কৃষিবিদ কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন। অর্থাৎ দক্ষ জনশক্তির অভাব নেই। অভাব রয়েছে সেই জনশক্তিকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সঙ্গে যুক্ত করার।
জনসংখ্যা, দক্ষতা কিংবা প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় বাংলাদেশ নেপালের চেয়ে অনেক এগিয়ে। কিন্তু শ্রমবাজার দখলের লড়াইয়ে অনেক পিছিয়ে। কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ বিদেশ মিশনে অর্থনৈতিক কূটনীতির চেয়ে প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। নতুন শ্রমবাজার খোঁজা, বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টি কিংবা দক্ষ কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির মতো কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে হয়নি।
গত বছর ইউরোপের কয়েকটি দেশে গিয়ে এই প্রতিবেদক জানতে পেরেছেন, শুধু জার্মানিতে সম্মানজনক পেশায় (হোয়াইট কলার জব) আছেন মাত্র পাঁচ হাজার বাংলাদেশি। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন ও পর্তুগাল মিলিয়ে এ সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার হবে। অন্যদিকে শুধু জার্মানিতেই ১ লাখ ৬৫ হাজার ভারতীয় রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই সম্মানজনক পেশায় নিয়োজিত।
জার্মানির বার্লিনে বাংলাদেশ দূতাবাসের পলিটিক্যাল কাউন্সিলর তানভীর কবির বলেছেন, বিদেশে পড়তে আসতে চাইলে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা ব্যাংক থেকে যে ঋণ নেন, তার জন্য দুই বছর কোনো কিস্তি কিংবা সুদ দিতে হয় না। তার প্রশ্ন, বাংলাদেশ কি এই সাপোর্ট দিচ্ছে?
তিনি আরও বলেছেন, ৩০ বছর ধরে ভারতীয়রা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্মানজনক পদ দখল করে ফেলেছেন। এখন ওইসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে তারা ভারতীয়দেরই প্রাধান্য দিচ্ছেন।
ইতালির মিলানে বসবাসরত কমর উদ্দীন আহমেদ বলেছেন, ‘মিলান মিশনে পাসপোর্ট-সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে মাসের পর মাস ঘুরতে হয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের। আর কী বলব ভাই! ইতালির মতো দেশেও আমাদের দেশের দূতাবাসের সামনে দালাল রয়েছে।’
একজন সাবেক কূটনীতিকের ভাষায়, ‘দূতাবাসগুলোর যেভাবে শ্রমবাজার তৈরিতে কাজ করার কথা, বাস্তবে তার অনেকটাই অনুপস্থিত। ফলে যে বাজার বাংলাদেশ পেতে পারত, তা অন্য দেশ নিয়ে যাচ্ছে।’
এ ব্যর্থতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের তরুণদের ওপর। বৈধ সুযোগ না থাকায় তারা দালালের কাছে যাচ্ছে। কেউ ভিজিট ভিসায় বিদেশ গিয়ে অবৈধভাবে থেকে যাচ্ছে। কেউ লিবিয়া হয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কেউ আবার সীমান্ত পেরোতে গিয়ে জীবন হারাচ্ছে।
ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, শুধু লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতি বছর অন্তত ৫০০ বাংলাদেশি মারা যায়। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য বলছে, গত এক দশকে ভূমধ্যসাগর বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিবাসন রুটে পরিণত হয়েছে। সেখানে প্রাণ হারানো হাজারো মানুষের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি। অথচ তাদের বড় অংশই বৈধভাবে বিদেশে কাজ করতে পারত।
শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার আরেকটি বড় উদাহরণ মধ্যপ্রাচ্য। একসময় সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, বাহরাইন, লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান ছিল। এখন সে বাজারেও নানা বিধিনিষেধ। ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া সীমিত করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২০১৮ সালে একটি হত্যাকাণ্ডের পর বাহরাইনও বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া প্রায় বন্ধ করে দেয়। এ শূন্যস্থানও দ্রুত পূরণ করেছে ভারত, নেপাল ও পাকিস্তান।
এদিকে বৈধ ভিসা যাচাই, ছাড়পত্র এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক কর্মীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে তারা অবৈধপথ বেছে নিচ্ছে। একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকের ভাষায়, বিদেশে বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা যদি শ্রমবাজার তৈরিতে আরও সক্রিয় হতেন, তাহলে এত মানুষ দালালের কাছে যেত না। এখন কর্মীরা নিজেরাই ভিসা সংগ্রহ করছে; কিন্তু ছাড়পত্র না পেয়ে শেষ পর্যন্ত অবৈধপথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
বৈধপথে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় মানব পাচারের কারবারও এখন বিশাল আকার নিয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে ৪ হাজার ৪৪৮টি মামলা করা হয়েছে। আসামির সংখ্যা ১৬ হাজার ৬৭৮ জন। কিন্তু অধিকাংশ মামলাই এখনো তদন্ত কিংবা বিচারাধীন। ফলে বড় চক্রগুলো ভেঙে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এর মধ্যে আবার বিদেশে বাংলাদেশের কিছু মিশনের বিরুদ্ধেও দুর্নীতি, অনিয়ম ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন বর্তমানে বিদেশে কর্মরত ও সাবেক ৩৮ জন কূটনীতিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কিছু মিশনে প্রবাসীদের সেবা নিশ্চিত করার চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীরও স্বীকার করেছেন, অতীতে বিভিন্ন বিদেশ মিশনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছিল। অনেক কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন। এখন বিদেশ মিশনগুলোকে প্রবাসীবান্ধব এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষায় কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই পরিবর্তন কত দ্রুত আসবে? একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার জনশক্তি। সেই জনশক্তিই এখন দেশের অন্যতম বড় সংকটে পরিণত হচ্ছে। কারণ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা এখন শুধু দক্ষতার নয়, কূটনৈতিক সক্ষমতারও। যে দেশ শ্রমবাজারের জন্য দরজায় কড়া নাড়বে, সে দেশই সুযোগ পাবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ যদি এখনই অর্থনৈতিক কূটনীতিকে অগ্রাধিকার না দেয়, বিদেশে মিশনগুলোকে শ্রমবাজার তৈরির দায়িত্বে সক্রিয় না করে এবং বৈধ অভিবাসনের পথ সহজ না করে, তাহলে দালাল চক্র আরও শক্তিশালী হবে। হারাবে নতুন নতুন শ্রমবাজার। আর ভূমধ্যসাগরের ঢেউ কিংবা সীমান্তের কাঁটাতার হয়তো আরও অনেক বাংলাদেশির স্বপ্ন গ্রাস করবে। কারণ শ্রমবাজার কখনো শূন্য থাকে না। বাংলাদেশ যেখানে থেমে যায়, সেখান থেকেই এগিয়ে যায় অন্য কোনো দেশগুলো।
সূত্রঃ আগামীর সময়