ভয়েস এশিয়ান, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬।। দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে ডিজিটাল প্রতারণা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া বিনিয়োগের প্রস্তাব, শেয়ারের দাম বাড়ার গুজব এবং দ্রুত বিপুল মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ডিজিটাল প্রতারণার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৭ বিলিয়ন বা ৭০০ কোটি ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতারণার কাজে ৮১টি মেসেঞ্জার গ্রুপ, এক হাজারের বেশি পেজ এবং ২৫টি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বিনিয়োগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব, দ্রুত মুনাফা অর্জনের প্রবণতা এবং যাচাই-বাছাই ছাড়া বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে অনেকেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি ও নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
যেভাবে প্রতারণার ফাঁদে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা
আলোচনায় ডিজিটাল প্রতারণার বিভিন্ন কৌশল তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অল্প সময়ে বিপুল মুনাফা বা লটারি জেতার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে নির্দিষ্ট শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়বে বলে মিথ্যা প্রচার এবং প্রতিষ্ঠানের গোপন তথ্য থাকার দাবি করে বিনিয়োগে প্ররোচিত করা।
এ ছাড়া আসল ব্রোকারেজ হাউস বা স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটের আদলে নকল ওয়েবসাইট তৈরি করে বিনিয়োগকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য ও অর্থ চুরির ঘটনাও আলোচনায় উঠে আসে।
চার্টার্ড ফাইন্যান্সিয়াল সোসাইটির সভাপতি মাহাতাব ওসমানী বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে ধারাবাহিকভাবে দুই অঙ্কের উচ্চ হারে মুনাফার নিশ্চয়তা দিলে এবং কখনো লোকসান হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিলে তা সন্দেহের চোখে দেখা উচিত। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এ ধরনের নিশ্চয়তা বাস্তবসম্মত নয়। তাই অস্বাভাবিক মুনাফার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিনিয়োগসংক্রান্ত পরামর্শ নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
আর্থিক প্রতিবেদন যাচাইয়ের পরামর্শ
ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফুর রহমান বলেন, বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা যাচাই না করেই শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত নেন। কোম্পানির নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও আর্থিক বিবরণী না পড়া এবং নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ উপেক্ষা করার কারণে তাঁরা বিনিয়োগের ঝুঁকি সম্পর্কে যথাযথ ধারণা পান না।
তিনি বলেন, কোম্পানির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা পর্যবেক্ষণ, বিশেষ করে নিরীক্ষকের মতামত ও গুরুত্বপূর্ণ নিরীক্ষাসংক্রান্ত বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করলে আর্থিক দুর্বলতা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা সম্ভব। তাই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রতারণা শনাক্তে এআই প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব
ডিজিটাল প্রতারণা প্রতিরোধে নজরদারি ও পর্যবেক্ষণব্যবস্থা আধুনিকায়নের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রতারণামূলক কার্যক্রম শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার কথাও জানান তিনি।
বিনিয়োগকারীদের পরিচয় যাচাইয়ের প্ল্যাটফর্ম গঠনের তাগিদ
আলোচকেরা বলেন, ডিজিটাল প্রতারণা ঠেকাতে শুধু নজরদারি বাড়ালেই হবে না, বিনিয়োগকারীদেরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শেয়ার কেনার আগে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি, ব্রোকারেজ হাউস ও বিনিয়োগ পরামর্শদাতার পরিচয় এবং নিবন্ধন যাচাই করা জরুরি।
অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া লিংকে প্রবেশ করে ব্যক্তিগত তথ্য, পাসওয়ার্ড কিংবা আর্থিক তথ্য সরবরাহ করা থেকেও বিরত থাকার পরামর্শ দেন তাঁরা।
বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদারে একটি সমন্বিত পাবলিক ভেরিফিকেশন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার তাগিদও দেওয়া হয়। এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম চালু হলে বিনিয়োগকারীরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, নিবন্ধন এবং অনুমোদনের তথ্য সহজে যাচাই করতে পারবেন। এতে ভুয়া প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করা এবং প্রতারণার ঝুঁকি কমানো সহজ হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং বিনিয়োগকারীদের আর্থিক শিক্ষার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও প্রতারণামূলক প্রস্তাব মোকাবিলায় দ্রুত তথ্য যাচাই এবং কার্যকর সতর্কীকরণব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।