ভয়েস এশিয়ান, ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬।। স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দেশে এখনো প্রায় চার কোটি মানুষ নিরক্ষর।
দেশের সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ২২ শতাংশের বেশি মানুষ এখনো পড়তে-লিখতে পারেন না। বিদ্যালয়বহির্ভূত ও ঝরে পড়া শিশু-কিশোর, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের একটি বড় অংশ এই নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
সাক্ষরতার এমন পরিস্থিতির মধ্যেই মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর এবারের প্রতিপাদ্য— ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’।
বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার গত কয়েক বছরে খুব ধীরগতিতে বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০২২ সালে ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এরপর ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তা ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে স্থির রয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে সাক্ষরতার হার বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাক্ষরতার হার বাড়াতে বিচ্ছিন্ন কিছু কর্মসূচি থাকলেও ধারাবাহিক ও বড় পরিসরের কার্যক্রমের ঘাটতি রয়েছে। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ঘিরে প্রতি বছর শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হলেও সারা বছর নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে কার্যকর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার চিত্র খুব একটা দেখা যায় না।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২২ লাখ ৮০ হাজার। ওই হিসাবে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ০৯ শতাংশ এবং নিরক্ষর মানুষের হার ২২ দশমিক ৯১ শতাংশ। সাত বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সীদের হিসাবে নিরক্ষর মানুষের সংখ্যা প্রায় পৌনে চার কোটি বলে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর তথ্যে উঠে এসেছে।
পরিসংখ্যানের সংজ্ঞা ও হিসাবের ভিত্তিতে সংখ্যায় কিছুটা পার্থক্য থাকলেও বিভিন্ন সরকারি তথ্যের সার্বিক চিত্র বলছে, দেশে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ মৌলিক সাক্ষরতার বাইরে রয়েছেন।
নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশু-কিশোর, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী এবং শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ। দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক অনাগ্রহ, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া এবং পর্যাপ্ত শিক্ষার সুযোগের অভাবসহ নানা কারণে এসব মানুষ শিক্ষার মূলধারার বাইরে রয়েছেন।
তবে দেশের কোন এলাকায় কতজন নিরক্ষর, তাদের বয়স, লিঙ্গ, পেশা ও আর্থসামাজিক অবস্থার হালনাগাদ তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়। শিক্ষাবিদদের মতে, নিরক্ষরতা দূরীকরণের কার্যকর পরিকল্পনার জন্য প্রথমেই ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক নিরক্ষর মানুষের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন।
নিরক্ষরতা কমানোর পাশাপাশি ঝরে পড়া কিশোর-কিশোরীদের কর্মদক্ষ করে তুলতে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মাধ্যমে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশের ৫৮ জেলার সদর উপজেলায় ‘কার্যকর সাক্ষরতা ও ব্যবহারিক কর্মদক্ষতা প্রশিক্ষণ (প্রাক্-বৃত্তিমূলক পর্যায়)’ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে প্রতি জেলায় ঝরে পড়া ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী মোট ৪ হাজার ৪৪০ জন কিশোর-কিশোরীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। প্রতিটি কোর্সে ৪৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১০০ ঘণ্টা কার্যকর সাক্ষরতা এবং ৩৬০ ঘণ্টা দক্ষতা প্রশিক্ষণ।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের শিক্ষা থেকে কর্মে উত্তরণের সুযোগ তৈরি করা। বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় নিবন্ধিত ৪ হাজার ৩১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪ হাজার ১৯৮ জন দক্ষ হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩ হাজার ৮৮২ জন চাকরি, শিক্ষানবিশ বা উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। সরাসরি কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন ৬০৩ জন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু, ঝরে পড়া কিশোর-কিশোরী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং অনগ্রসর প্রাপ্তবয়স্কদের দ্রুত সাক্ষর ও দক্ষ করে তোলাকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।