ভয়েস এশিয়ান, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬।। গৌরবের ৪৮ বছর পেরিয়ে ৪৯ বছরে পদার্পণ করেছে এ সময়ে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আজ মঙ্গলবার দলটির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।
১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর বর্তমান সময়ে এসে সুসময় পার করছে বিএনপি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী দলটি এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। ক্ষমতার প্রথম ৬ মাস পার করেই দলের মধ্যে বেশকিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ পরিবর্ততের মধ্য দিয়ে দলটিতে বড় ধরনের পরির্তনেরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। নেতারা বলছেন, এবার সুসময়ে দলকে সুসংগঠিত করার সুযোগটিকে কাজে লাগাতে চায় বিএনপি।
এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ৫ দিনের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নয়াপল্টনসহ সারা দেশের জেলা, থানায় র্যালিসহ নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে জনগণের ভালোবাসা, সমর্থন ও সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে চলেছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি। এর মধ্যে গত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন, দমন-পীড়ন এবং চরম প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মী। কোনোভাবেই তারা হাল ছেড়ে দেননি। দলের আস্থার প্রতীক চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় এগিয়ে চলেছে বিএনপির অকুতোভয় পথচলা। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দলটির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এর কারণ দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম-নিপীড়ন পেরিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে দলটি। রাষ্ট্রক্ষমতায় দলটি এবারই প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করতে যাচ্ছে। তাই অন্য যেকোনো বারের থেকে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে রাজধানীসহ সারা দেশে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ ও উদ্দীপনা লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এবার ক্ষমতাসীন বিএনপির অন্যতম অঙ্গীকার- জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠন ও সুশাসন নিশ্চিত করা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার গঠনের পর প্রথম এ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের মাধ্যমে বিএনপি তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসই শুধু স্মরণ করছে না; বরং একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার নতুন রাজনৈতিক বার্তা নিয়ে জনগণের আরো কাছাকাছি যাওয়ার সুদৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছে। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন, দমন-পীড়নের অবসান ঘটিয়ে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে বিএনপি। তাই এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
সরকার গঠনের পর প্রথম এ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রাক্কালে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের শীর্ষস্থানীয় নেতারা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, দায়িত্বশীলতা এবং দলের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। তারা বলছেন, সরকার গঠনের পর এটি বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দীর্ঘ ১৭ বছরের লড়াই, সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক পালাবদলের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে পালিত হতে যাওয়া এ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দলটির নেতাকর্মীদের কাছে এক অন্যরকম ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করছে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ‘বিএনপি কেবল গতানুগতিক ক্ষমতার রাজনীতি করার জন্য জন্ম নেয়নি; এটি এদেশের মেহনতি মানুষ, গণতন্ত্রকামী জনতা এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আস্থাশীল একটি বিশাল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে ফ্যাসিবাদী শক্তি আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করতে চেয়েছিল, দলের নেতাকর্মীদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়েছে। কিন্তু শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শে গড়া এই দল জনমানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই থেকে একচুলও পিছপা হয়নি। আজ আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছি। ফলে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মূল তাৎপর্য হলো, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে নিজেদের আরো বেশি নিবেদিত করা এবং সুশাসন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।’
দলের স্থায়ী কমিটির আরেক জ্যেষ্ঠ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই ক্ষণে আমাদের প্রধান অঙ্গীকার হলো- গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করে জনকল্যাণ নিশ্চিত করা। অতীতে দেশের প্রতিটি সংকটে বিএনপি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। আগামী দিনেও জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং দেশকে একটি সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রে পরিণত করতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল আরো সুসংগত ও গতিশীলভাবে কাজ করে যাবে। সরকারের সাফল্য মানেই জনগণের সাফল্য, আর সেই লক্ষ্যেই আমাদের নেতাকর্মীরা কাজ করে যাচ্ছেন।’
এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ দলের সার্বিক প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘গৌরবের ৪৮ বছর সফলভাবে অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। বহু সংগ্রাম, সংকট, চরম নিপীড়ন এবং শোককে বুকে ধারণ করেই আমাদের এ দীর্ঘ পথচলা। শত অত্যাচার ও ফ্যাসিবাদী শক্তির দমন-পীড়ন সত্ত্বেও কেউ কখনো বিএনপিকে ন্যূনতম ক্ষতি বা জনগণের মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি; বরং সব বাধা পেরিয়ে বিএনপি আজ জনগণের আরো কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। দল আরো বেশি শক্তিশালী ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের মূল প্রত্যয় নিয়ে এই দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই আদর্শ ও জনগণের আস্থাকে ধারণ করে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।’
রিজভী আরো বলেন, সরকার গঠনের পর এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কোনো সাধারণ আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জনগণের অধিকার রক্ষা এবং উৎপাদনের রাজনীতিকে আরো বেগবান করার একটি নতুন শপথ নেওয়ার দিন। দলীয় নেতাকর্মীদের সাধারণ মানুষের কল্যাণে গঠনমূলক ও সামাজিক কার্যক্রমে নিজেদের আরো বেশি সম্পৃক্ত রাখার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।
জনগণের প্রত্যাশা পূরণে নতুন ভাবনায় বিএনপি : দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক পালাবদলের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থেকে এবারই প্রথম নিজেদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছে বিএনপি। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির মূল ভাবনাজুড়ে রয়েছে- জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং একটি সমৃদ্ধশালী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা।
দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে রাজপথে লড়াই করা দলটি এখন সরকারে থাকায় এবারের আয়োজনে গতানুগতিক রাজনৈতিক শোডাউনের চেয়ে জনকল্যাণমূলক ও সুশৃঙ্খল কর্মসূচিকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। দলের নীতিনির্ধারক ও শীর্ষনেতারা মনে করছেন, রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার অর্থ হলো জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা বহুগুণ বেড়ে যাওয়া। তাই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ ক্ষণটিকে তারা আত্মতুষ্টির পরিবর্তে দলের ভেতর সুশাসন বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সাংগঠনিক কর্মসূচি : প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি পাঁচ দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। গত ২৬ আগস্ট নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক যৌথসভা শেষে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। ১ সেপ্টেম্বর ভোর ৬টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের কার্যালয়গুলোয় দলীয় পতাকা উত্তোলন। সকাল ৯টায় দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে শেরেবাংলা নগরে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ।
বিশেষ আলোচনা সভা : আগামী ৫ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টায় রাজধানীর কেআইবি (কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন) মিলনায়তনে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এক বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারাসহ দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্টজনরা বক্তব্য দেবেন।
পরিবেশ ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি : প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের অংশ হিসেবে উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের পোনা অবমুক্তকরণ এবং দেশব্যাপী ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা হবে। পোনা অবমুক্তকরণ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেবেন দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেবেন যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি।
স্থানীয় ও সর্বস্তরের অংশগ্রহণ : কেন্দ্র ঘোষিত কেন্দ্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি দেশের সব জেলা, মহানগর, উপজেলা ও পৌর ইউনিটগুলো নিজ নিজ সুবিধাজনক সময়ে আলোচনা সভা, র্যালি এবং বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি পালন করবে। এছাড়া দলের পক্ষ থেকে বিশেষ পোস্টার প্রকাশ করা হয়েছে।