ভয়েস এশিয়ান, ২৪ আগষ্ট, ২০২৬।। কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার একের পর এক হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সেখানে অবস্থানরত হাজারো বাংলাদেশি পর্যটক। মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নয়জনের মৃত্যুর পর অগ্নিনিরাপত্তা বিধি মানা হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ে অভিযান শুরু করে কলকাতা পুলিশ, পৌরসভা, দমকল ও বিদ্যুৎ বিভাগ। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’ খ্যাত মারকুইজ স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট ও মির্জা গালিব স্ট্রিটে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে দুই শতাধিক হোটেল। এমন অবস্থায় বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার বাংলাদেশি পর্যটক।
পর্যটক সুরক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান নেওয়ার কথা আগেই জানিয়েছিল শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। মির্জা গালিব স্ট্রিটের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর ওই দিন সন্ধ্যা থেকেই অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে অভিযান শুরু করে নিউমার্কেট থানার পুলিশ। উপমুখ্যমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল নিজেই অভিযানে অংশ নিয়ে বেশ কয়েকটি হোটেল বন্ধ করেন।
এর মধ্যেই কলকাতা পুলিশ, কলকাতা পৌরসভা, দমকল ও সিইএসসি (বিদ্যুৎ বিভাগ)-এর সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিটি কলকাতার সাড়ে ৩ হাজারের বেশি হোটেলের নিরাপত্তাবিধি পর্যালোচনা করবে। বৃহত্তর কলকাতার ক্ষেত্রে এই তদন্ত কমিটি এতটা সক্রিয় না হলেও নিউমার্কেট এলাকায় রীতিমতো কড়া অবস্থান নিয়েছে এই কমিটি।
গত শনিবার থেকে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ২২১টি হোটেল ও ৯টি রেস্তোরাঁ বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তাবিধি না মানায় একাধিক হোটেলের বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে।
একের পর এক হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন কলকাতার নিউমার্কেটে অবস্থান করা বাংলাদেশি নাগরিকেরা। কলকাতায় এই মুহূর্তে অবস্থান করছেন প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি পর্যটক। তাঁদের মধ্যে ৭ হাজার রয়েছেন নিউমার্কেট এলাকায়। তাঁদের অনেকে বাধ্য হয়ে কলকাতা ছাড়ছেন। কেউ নতুন হোটেল খুঁজছেন, আবার কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
দালাল ধরে নতুন করে হোটেল পাওয়া গেলেও কোথাও কোথাও আগের তুলনায় অনেক বেশি ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। কিছু হোটেলের ভাড়া দেড় থেকে দ্বিগুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
কলকাতার পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই এলাকায় বাংলাদেশি পর্যটকদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে হোটেল, খাবারের দোকান, পরিবহন, কেনাকাটা ও বিভিন্ন পরিষেবার ব্যবসা। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে নানা কারণে এই ব্যবসায় ধাক্কা লেগেছিল।
কলকাতার গ্রিন লাইন পরিবহনের শ্যামল ঘোষ বলেন, সীমান্ত থেকে প্রতিটি বাসে যাত্রী পরিপূর্ণ হয়ে যাত্রীরা কলকাতায় আসছেন। কিন্তু যাত্রীদের থাকার মতো হোটেল এই মুহূর্তে নেই। অনেকেই আশপাশের এলাকার হোটেল খুঁজে সেদিকে যাচ্ছেন। তবে ভাড়া দ্বিগুণ-তিন গুণের বেশি বেড়ে গেছে। সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান নিয়েছে, আমরা এই অবস্থানকে সমর্থন জানাই। তবে হোটেল মালিকদের কিছুটা সময় দিলে ভালো হতো।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকাল থেকেই নিউমার্কেটে পর্যটকদের হোটেল থেকে বের হয়ে যেতে দেখা যায়। অনেক পর্যটক এই ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে রীতিমতো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান।
নিউমার্কেটের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় রিকশাচালক থেকে পেশাজীবী মানুষেরাও সরকারের এমন অতিসক্রিয় অবস্থানে এদিন ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, টুরিস্ট ভিসা শুরু হওয়ার পর পর্যটকের সংখ্যা কিছুটা বাড়তে শুরু করার সময় নতুন করে হোটেল বন্ধের ঘটনা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। তবে প্রশাসন বলছে, পর্যটকদের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। অগ্নিনিরাপত্তা বিধি না মানা হোটেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চলবে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) গভীর রাতে কলকাতার নিউমার্কেটের ১৫জি, মির্জা গালিব স্ট্রিটে ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ গেছে ৯ জনের। এর মধ্যে ৭ জনই বাংলাদেশি নাগরিক, বাকি ২ জন ভারতীয়। নিহতদের মধ্যে ৬ জন পুরুষ, ২ জন নারী ও ১টি শিশু ছিল।
নিহত বাংলাদেশিরা হলেন—আকরাম আলী (৭৪), দেবাশীষ দত্ত (৩৯), আফসানা শিরমিন (২৭), সর্নাশীষ দত্ত (২), বাবু আহমেদ (৩৭), রেবতী সরকার এবং এস. এম. আলিমুজ্জামান।
অন্যদিকে, দুই ভারতীয় নাগরিকের মধ্যে একজন ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা সন্দীপ পাশওয়ান (১৯), অন্যজন শিলিগুড়ির বাসিন্দা যোগ নারায়ণ আগারওয়াল (৬৮)।