ভয়েস এশিয়ান, ০৬ নভেম্বর, ২০২৬।। দেশের কৃষি খাতে সারের সরবরাহ বাড়ানো, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং শিল্প খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নতুন তিনটি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ভোলায় দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া, চট্টগ্রামে বছরে ৪ লাখ মেট্রিক টন টিএসপি এবং নরসিংদীর পলাশে বছরে ২৪ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া ফরমালডিহাইড-৮৫ (ইউএফ-৮৫) উৎপাদন ক্ষমতার কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশীয় সার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষি ও শিল্প খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সার উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি।
বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির অধীনে বর্তমানে সাতটি সার কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি ইউরিয়া ও দুটি নন-ইউরিয়া সার কারখানা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা ছিল ২৬ লাখ মেট্রিক টন। ওই অর্থবছরে বিসিআইসির কারখানাগুলোতে উৎপাদিত হয়েছে ১১ লাখ ৭৩২ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন, যা মোট চাহিদার ৪২ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
একই অর্থবছরে দেশে টিএসপি ও ডিএপি সারের চাহিদা ছিল যথাক্রমে ৭ লাখ ৫০ হাজার ও ১৪ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন। বিপরীতে বিসিআইসির কারখানাগুলোতে উৎপাদন হয়েছে যথাক্রমে ৬৮ হাজার ২৫৯ ও ৮২ হাজার ১৪২ মেট্রিক টন। এতে চাহিদার মাত্র ৯ দশমিক ১০ শতাংশ টিএসপি ও ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ ডিএপি দেশীয় উৎপাদন থেকে এসেছে। ফলে এসব সারের চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বিসিআইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়া সারে ২৩ হাজার টাকা, টিএসপি সারে ৪৯ হাজার ১৭০ টাকা এবং ডিএপি সারে ৯৮ হাজার ৮৪০ টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো ও আমদানি নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি ভর্তুকির চাপ বিবেচনায় নিয়ে নতুন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান কারখানাগুলোর আধুনিকায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগও রয়েছে।
ভোলায় দৈনিক ১ হাজার ৭০০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের পরিকল্পনা
দেশের ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ভোলায় নতুন ইউরিয়া সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত কারখানাটিতে দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটি চালু রাখতে দৈনিক ৪৫ থেকে ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হবে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, ‘দেশের ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। ভোলায় প্রস্তাবিত ইউরিয়া সার কারখানা নির্মাণের কাজ বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ, কারিগরি প্রস্তুতি, অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।’
ফসফেটজাত সারের দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গায় টিএসপিসিএল কমপ্লেক্সের অব্যবহৃত জায়গায় নতুন টিএসপি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা হবে ৪ লাখ মেট্রিক টন।
বর্তমানে বিসিআইসির টিএসপি কমপ্লেক্সে কাঁচামালের সংকট ও প্ল্যান্টের সমস্যার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নতুন কারখানা স্থাপিত হলে টিএসপি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের সার সরবরাহে দেশীয় উৎপাদনের অবদান সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।
বিসিআইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘টিএসপি সারের দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে নতুন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিকগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে টিএসপি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে এবং দেশের সার সরবরাহে দেশীয় উৎপাদনের অবদান বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।’
পলাশে ইউএফ-৮৫ কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা
নরসিংদীর পলাশে ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসির অব্যবহৃত জায়গায় বছরে ২৪ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষমতার ইউরিয়া ফরমালডিহাইড-৮৫ (ইউএফ-৮৫) কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামো ও অব্যবহৃত জমির কার্যকর ব্যবহার বাড়বে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিল্পপণ্যের উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।
এ বিষয়ে বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, ‘বিদ্যমান শিল্প প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জায়গা কাজে লাগিয়ে নতুন শিল্প স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। পলাশে প্রস্তাবিত ইউএফ-৮৫ কারখানার ক্ষেত্রে উৎপাদন প্রযুক্তি, বাজার চাহিদা ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।’
নতুন তিনটি কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নির্মাণ ও উৎপাদন পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, দক্ষ শ্রমিক ও পরিচালনাকর্মীদের পাশাপাশি পরিবহন, সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট সেবা খাতেও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।
ভোলা, চট্টগ্রাম ও নরসিংদীতে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় শিল্প অবকাঠামোর ব্যবহার বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।
বিসিআইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘নতুন কারখানা স্থাপনের ফলে নির্মাণকাজ থেকে শুরু করে উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে কতজনের কর্মসংস্থান হবে, তা প্রকল্পের চূড়ান্ত নকশা, উৎপাদন প্রযুক্তি ও জনবল কাঠামো নির্ধারণের পর বলা সম্ভব হবে। আমরা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্প খাতে দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে চাই।’
সরকারের এ পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য দেশীয় সার উৎপাদন বাড়িয়ে কৃষি খাতে সরবরাহ জোরদার করা। তবে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন, প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ, অর্থায়ন ও কারিগরি প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করবে নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন।