ভয়েস এশিয়ান, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬।। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও বিশ্ববাণিজ্যের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা আরও কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামার আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
‘রেজিলিয়েন্স আন্ডার স্ট্রেইন, আর্জেন্ট চয়েসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, বৈশ্বিক অর্থনীতি নানা সংকটের মধ্যেও টিকে থাকলেও জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রবৃদ্ধি বাড়ার পর আবার ধীরগতির আশঙ্কা
আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। তবে ২০২৭ সালে প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
অর্থাৎ চলতি বছরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সামান্য উন্নতির সম্ভাবনা থাকলেও পরের বছর প্রবৃদ্ধির গতি কমতে পারে। এর প্রভাব বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অভ্যন্তরীণ চাহিদায় পড়তে পারে।
আঞ্চলিক কয়েকটি দেশের তুলনায়ও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কম। আইএমএফের পূর্বাভাসে ২০২৬ সালে ভারতের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ, ভিয়েতনামের ৮ দশমিক ৪ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং চীনের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস নেপালের সমান, ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
তবে দেশগুলোর অর্থবছর ও হিসাবের সময়সীমায় পার্থক্য থাকায় এসব পরিসংখ্যান তুলনার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
২০২৭ সালে মূল্যস্ফীতি ১০.৯ শতাংশ হতে পারে
প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়েও উদ্বেগের কথা জানিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে। তবে ২০২৭ সালে আবার বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
এই পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে। খাদ্য, পরিবহন, বাসস্থান ও চিকিৎসার মতো প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পেলে সীমিত আয়ের পরিবারগুলো বেশি চাপে পড়বে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলতে থাকলে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়লে দেশের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামে যুক্ত করলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতি বাড়তে পারে
বাংলাদেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্যেও অবনতির পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চলতি হিসাবের ভারসাম্য জিডিপির প্রায় শূন্য শতাংশ ছিল। ২০২৬ সালে তা ঘাটতিতে পড়ে জিডিপির শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে ঘাটতি বেড়ে ২ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়লে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় এবং সেবা খাতের বৈদেশিক লেনদেন এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে আমদানি বিল বাড়তে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদার ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে চলতি হিসাবের ঘাটতির পূর্বাভাস থেকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা ডলারের বাজারে চাপের সুনির্দিষ্ট মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না।
জ্বালানির দাম বাড়লে বাড়বে উৎপাদন ব্যয়
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইএমএফ। সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চের শেষ দিকে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে উঠেছিল। জুনের শুরুতে তা ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি স্থিতিশীল হয়। সেপ্টেম্বরে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধের আগের মাত্রার ৮৮ শতাংশে পৌঁছায়।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে অপরিশোধিত তেলের গড় দাম আগের বছরের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেশি থাকতে পারে। একই সময়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়তে পারে ৪৮ শতাংশ।
বাংলাদেশের জন্য এ পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের জ্বালানি চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি ও শিল্পকারখানার খরচও বাড়তে পারে।
তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক চাহিদা কমে গেলে রপ্তানি আয়েও চাপ তৈরি হতে পারে।
প্রযুক্তি খাতে পিছিয়ে থাকাও চ্যালেঞ্জ
আইএমএফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে সব দেশ সমান সুবিধা পাচ্ছে না। জ্বালানি রপ্তানিকারক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত দেশগুলো তুলনামূলক সুবিধা পেতে পারে। অন্যদিকে, জ্বালানি আমদানিনির্ভর ও প্রযুক্তি খাতে কম সম্পৃক্ত দেশগুলোকে বাড়তি ব্যয় এবং দুর্বল চাহিদার চাপ সামলাতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি বৈশ্বিক এআই ও উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় দেশের অংশগ্রহণও তুলনামূলক সীমিত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সামাল দিতে দেশটিকে বাড়তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার পরামর্শ
জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দিতে ব্যাপক ভর্তুকির পরিবর্তে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সাময়িক ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারদর কৃত্রিমভাবে কমিয়ে রাখার উদ্যোগে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার তুলনায় তিন থেকে ২২ গুণ পর্যন্ত বেশি সরকারি অর্থ ব্যয় হতে পারে। এ ধরনের ভর্তুকি দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকেও দুর্বল করতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, প্রকৃত উপকারভোগীদের শনাক্ত করা এবং তাঁদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে রাজস্ব আয় বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো এবং সরকারি ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও রপ্তানি বহুমুখীকরণে জোর
ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় জ্বালানির উৎস বহুমুখী করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে আইএমএফ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশের জন্য জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার, বিকল্প উৎসের উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, নতুন বাজার অনুসন্ধান ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা নয়; মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এসব চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হতে পারে।