| ঢাকা, বাংলাদেশ | রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬ |
1767864071.png 1647622201.jpg

বিভাগ : অর্থ-বাণিজ্য তারিখ : ০২-১০-২০২৬

দিশেহারা সাধারণ ভোক্তা

ছুটির দিনে বাজারে লাগামহীন মূল্যের চাবুক


  ভয়েস এশিয়ান ডেস্ক


ভয়েস এশিয়ান, ০২ অক্টোবর, ২০২৬।। এক কাপ চা কিংবা সামান্য একটু স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস—সারা সপ্তাহের হাড়ভাঙা খাটুনির পর শুক্রবারের আলো ফুটলে এইটুকুই তো চাওয়া থাকে ঢাকার খেটে খাওয়া, সাধারণ মানুষের। শ্রমজীবী, নিম্নবিত্ত আর নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলোর কাছে ছুটির দিনটি আসার কথা ছিল একটু শান্তিতে দুই বেলা দুটো ভালো-মন্দ খাওয়ার সুযোগ হিসেবে। কিন্তু রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারগুলোতে এদিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই যেন এক অদৃশ্য উত্তাপ আছড়ে পড়ে। সেই উত্তাপ উনানের নয়, চড়া দামের। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জন্য এই ছুটির দিনটিই এখন মাসের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে পণ্যের দর যাই থাক, শুক্রবার এলেই বিক্রেতাদের হাঁকডাকে যেন ছুটির দর হাঁকা হয়।

শুক্রবার (০২ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, আগারগাঁও, রায়ের বাজার এবং মোহাম্মদপুর কৃষি বাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে ছুটির দিনের এই বাজার নৈরাজ্য আর সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার এক করুন বাস্তবচিত্র। পকেটের টানাটানিতে থলি অর্ধেক খালি রেখে বাড়ি ফেরার গ্লানি এখন সাধারণ মানুষের নিত্যসঙ্গী।

ছুটির দিনে ‘ঝুঁকি মাশুল’: শুক্রবার সকালে কাঁচাবাজারগুলোতে গিয়ে দেখা যায় উপচে পড়া ভিড়। দূর থেকে দেখে মনে হতে পারে বাজারে উৎসবের মেজাজ। কিন্তু কাছে গেলেই চোখে পড়ে থমথমে মুখ, উদ্বিগ্ন চোখ আর পকেটের হিসাব মেলানোর আকুল চেষ্টা। ভিড়টা এখানে আনন্দের নয়, জীবনধারণের নির্মম বাধ্যবাধকতার। সপ্তাহে প্রতিদিন কাজ ফেলে বাজারে আসার সুযোগ যাদের নেই, তারা ছুটির দিনে একবারে পুরো সপ্তাহের রসদ কিনতে আসেন। আর এই চাপকেই সুযোগ বানিয়ে নেন একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী।

বাজার দর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে কমদামি সবজি হিসেবে গণ্য হওয়া পেঁপে ও আলু কিনতে হলেও কেজিপ্রতি গুণতে হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। কিন্তু পেঁপে আর আলু দিয়ে তো আর প্রতিদিনের হাঁড়ি চলে না! এর বাইরের প্রতিটি সবজির দর সাধারণের নাগালের বহুদূর দিয়ে হাঁটছে।

বেগুন কিনতে গেলে পকেট খালি হওয়ার উপক্রম—লম্বা বেগুন ১০০ টাকা আর গোল বেগুন বিকোচ্ছে ১২০ টাকায়। অন্য সাধারণ সবজি যেমন পটল, চিচিঙ্গা, ঢেঁড়স, কচুরমুখি ও লাউয়ের কেজি ৮০ টাকা ছুঁয়েছে। ঝিঙা ও করলা কোথাও ৮০ টাকা, আবার কোনো কোনো বাজারে গিয়ে ঠেকছে ১২০ টাকায়। মাঝারি আকারের একটি ফুলকপি কিনতে ক্রেতাকে গুণতে হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা। এর মধ্যে শীতের আগাম বার্তা নিয়ে আসা নতুন শিম এখন বাজারের সবচেয়ে দামি রূপ ধারণ করেছে; স্থানভেদে শিমের কেজি ২০০ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে।

একমাত্র সামান্য স্বস্তি দেখা গেছে কাঁচা মরিচের বাজারে। কয়েক সপ্তাহ আগে যে মরিচ ২০০ টাকার ঘর ছুঁয়েছিল, তা মোহাম্মদপুর বা রায়ের বাজারে ১২০ থেকে ১৪০ টাকায় পাওয়া গেলেও শেওড়াপাড়া ও মিরপুরের বাজারে ২০০ টাকাতেই আটকে আছে। সালাদের শসা ৫০ থেকে ৬০ টাকায় পাওয়া গেলেও দেশি শসার কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা।

কাজীপাড়া বাজারের সবজি বিক্রেতা হাসান বলেন, “শুক্রবারে বাজারে ক্রেতার ঢল নামে। পাইকারি বাজারেও সেদিন চাহিদা থাকে আকাশচুম্বী। বাড়তি দামে কিনে আনলে পরিবহন আর আড়তের খরচ তুলে আমাদের খুচরা বাজারে কয়েক টাকা বাড়াতেই হয়।”

মিরপুরের আরেক বিক্রেতা মাজহারের মতে, “ছুটির দিনে সবাই একসঙ্গে ভালো কিছু রান্না করতে চান, ফলে বেগুন, শিম বা মরিচের মতো পণ্যের চাহিদা হুট করে বাড়ে। বাজারে সরবরাহ টান পড়লেই তো দাম একটু চড়বে।”

তবে বিক্রেতাদের এসব যুক্তিকে স্রেফ পকেট কাটার বাহানা বলেই মনে করছেন সাধারণ ক্রেতারা। শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যে বেগুনটা বৃহস্পতিবার বিকেলে ৮০ টাকায় বিকিয়েছে, শুক্রবার সকালে একই বেগুন ১০০-১২০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। ছুটির দিনে শ্রমজীবী মানুষ দুটো কেনাকাটা করতে এলেই কি তাদের পকেট খালি করতে হবে? এটা স্পষ্টত সিন্ডিকেট আর অসৎ সুযোগ সন্ধান।”

একই এলাকার গৃহিণী সেলিনা আক্তারের কণ্ঠে ফুটে উঠল অভাবের করুণ চিত্র। তিনি বললেন, “আগে ছুটির দিনে এক কেজি, দেড় কেজি করে সবজি কিনতাম। এখন আধা কেজি বা পোয়া মেপে কিনতে হয়। দাম যদি প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বাড়ে, তবে চার-পাঁচ পদের সবজি কিনতে গিয়েই সপ্তাহের পুরো বাজেট তছনছ হয়ে যায়। বাচ্চার পাতে এক টুকরো সবজি দেব, সেই উপায়ও রাখেনি।”

মিরপুর ৬ এলাকার মাইনুল হাসান জানান, একই বাজারের পাশাপাশি দুটো দোকানেও দামের তফাৎ থাকছে ১০ থেকে ২০ টাকা। যে যার মতো দর হাঁকাচ্ছে, কোনো তদারকি নেই।

পুষ্টির শেষ ভরসাতেও টান: সবজির বাজারে যখন আগুনের উত্তাপ, তখন প্রোটিন বা আমিষের শেষ আশ্রয়টুকুতেও টান পড়েছে। গরুর মাংস কিংবা খাসির মাংস নিম্নবিত্তের জন্য বহু আগেই ‘স্বপ্নের খাবার’ হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ পুষ্টির ঘাটতি মেটাতে নির্ভর করত ব্রয়লার মুরগি, ডিম কিংবা সস্তা চাষের মাছের ওপর। কিন্তু এখন সেই ব্রয়লার মুরগিও সাধারণের পাতে উঠতে বাধা পাচ্ছে।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, স্থানভেদে ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন চালচিত্র বদলে দিচ্ছে এই বাড়তি দর।

শেওড়াপাড়া বাজারের মুরগি বিক্রেতা শাহ আলম বলেন, “পাইকারি বাজার থেকেই আমাদের বেশি দামে মুরগি কিনতে হচ্ছে। খামার থেকে মুরগি কম আসছে। তার ওপর জ্বালানি তেলের দাম আর গাড়ি ভাড়া বাড়ার কারণে পরিবহন খরচ দ্বিগুণ হয়েছে। আমরা বাধ্য হয়েই দাম মেলাচ্ছি।”

কাজীপাড়ার বিক্রেতা মাহিদুর রহমান যোগ করেন, “প্রতিদিনই নতুন রেটে মুরগি কিনতে হয়। আমরা কম দামে কিনতে পারলে কম দামেই তো বেচতাম।”

কিন্তু বিক্রেতাদের এই যুক্তির পেছনের চিত্র অন্যরকম। ক্রেতাদের অভিযোগ, পাইকারি বাজারে দাম পাঁচ টাকা বাড়লে খুচরা বাজারে বাড়ে বিশ টাকা। আর পাইকারিতে দাম কমলে খুচরা বাজারে তার প্রভাব আসতে সপ্তাহ গড়িয়ে যায়।

মিরপুরের দিনমজুর হাসান আলী ভারাক্রান্ত মনে বলেন, “কয়েক দিন আগেও ১৮০ টাকার নিচে ব্রয়লার পেয়েছি। এখন এসে দেখি দাম আবার চড়া। পরিবারের মানুষ চারজন, আধা কেজি মুরগি কিনে তো আর চারজনের পেট ভরে না। মাছ-মাংসের আশা ছেড়ে এখন শাক-সবজি খেয়ে বাঁচব, সেটারও উপায় নেই।”

আগারগাঁওয়ের বাসিন্দা নাসরিন আক্তার মলি আক্ষেপ করে বলেন, “সন্তানদের একটু প্রোটিন দিতে আগে ব্রয়লার মুরগিটাই ভরসা ছিল। এখন মুরগির দাম, ডিমের দাম আর সবজির দাম একসঙ্গে বেড়েছে। ডজন ডিম কিনতে লাগছে ১৫৫ টাকা, একটি ডিম পড়তেছে প্রায় ১৩ টাকা। মাসের নির্দিষ্ট আয় দিয়ে এতদিকের খরচ সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আমরা চলব কীভাবে?”

মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই: একই করুণ হাল মাছের বাজারেও। সস্তা মাছ হিসেবে পরিচিত তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি দরে, আর পাঙাশের কেজি ২২০ থেকে ২৩০ টাকা। মাঝারি রুই বা কাতলা কিনতে গেলে কেজিপ্রতি গুণতে হচ্ছে ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা, আর একটু বড় সাইজের রুই হলে দর হাঁকা হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা এবং শিং মাছ ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিকোচ্ছে।

নদী বা দেশি মাছ তো সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে। ট্যাংরা ৭০০ টাকা, দেশি কই ৮০০ টাকা, শোল ৭০০ টাকা এবং ভালো মানের রূপচাঁদা বা নদীর বেলে মাছ কিনতে গেলে কেজিতে হাজার টাকার উপরে গুণতে হচ্ছে।

রায়ের বাজারের মাছ বিক্রেতা সুলতান আহমদ বলেন, “মাছের দাম জোগান আর ক্রেতার ওপর নির্ভর করে। সকালে এক দাম তো বিকেলে আরেক দাম। তবে সামগ্রিকভাবে পাইকারি বাজার থেকেই সব মাছ চড়া দামে আসছে।”

নিম্নবিত্তের দীর্ঘশ্বাস: সবজি, মুরগি আর ডিমের এই যৌথ দামের চাপ ঢাকা শহরের নিম্নবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলোকে এক অমীমাংসিত সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পুষ্টির ন্যূনতম উপাদানটুকুও প্রতিদিনের খাবার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে।

ছুটির দিন যেখানে পরিবার নিয়ে একটু ভালো খাওয়ার দিন হওয়ার কথা ছিল, সেখানে তা পরিণত হয়েছে এক মানসিক যন্ত্রণায়। অসাধু ব্যবসায়ীদের চড়া মুনাফার সুযোগ, পরিবহন ব্যয়ের অজুহাত আর তদারকিবহীন বাজারের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। নিয়মিত ও কড়া বাজার তদারকি, পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি ও অযৌক্তিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে ছুটির দিনের এই বাজার-যন্ত্রণা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে।

 

 





 

অর্থ-বাণিজ্য

সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স এলো ৩৪ হাজার কোটি টাকা

দুই মাস ধরে চড়া ডিমের বাজার

সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে মিলছে না এলপিজি, ডিসিদেরকে মাঠে নামার নির্দেশ

দুই হাজার টাকা ছাড়াল ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম

বাংলাদেশকে ১০ কোটি ডলারের ঋণ দিচ্ছে এডিবি

জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ধাক্কা বাজারে, বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম

বাজারের ব্যাগ ভরার আগেই পকেট ফাঁকা

কিলোমিটার প্রতি ২০ পয়সা বাসভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব

একই দিনে বিশ্ববাজারে কমলেও দেশে বেড়েছে জালানি তেলের দাম

দেশে সব ধরনের জ্বালানির দাম লিটারে বাড়লো ২০ টাকা

অর্থ-বাণিজ্য বিভাগের আরো খবর


1585646778.gif 1585646793.jpg 1585646805.gif

1615174445.gif

1761832476.jpg




Copyright © 2017-2026   |   Voice Asian - Asian Based News Portal
Contact: voiceasianinfo@gmail.com
   
Visitor Counter
Online12
Today862
Yesterday5689
TOTAL7467593