ভয়েস এশিয়ান, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬।। দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার চাপ কাটিয়ে দেশের ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করতে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, একীভূতকরণ, ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি, আমানত সুরক্ষা এবং তদারকি ব্যবস্থায় পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যাংক খাতকে নতুন কাঠামোয় আনার চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠন এবং সংকটে পড়া ব্যাংকের জন্য রেজল্যুশন ব্যবস্থা চালুর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ কার্যকর হয়েছে।
তবে সংস্কারের পাশাপাশি সামনে রয়েছে বড় বাস্তবতা। জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ফলে নতুন কাঠামোর কার্যকারিতা এখন নির্ভর করছে ঋণ আদায়, সম্পদ পুনরুদ্ধার, মূলধন শক্তিশালীকরণ এবং আমানতকারীদের আস্থা কতটা ফিরিয়ে আনা যায় তার ওপর। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে সামান্য গতি এবং ব্যাংক আমানতে প্রবৃদ্ধি খাতটিতে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিতও দিচ্ছে।
খেলাপি ঋণে বড় চাপ
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মার্চ থেকে জুন—তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ এখন শ্রেণিকৃত।
এ অবস্থায় ঋণ আদায় ও ব্যাংকের সম্পদের মান উন্নয়নকে সংস্কারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য করা হয়েছে। ঋণ পুনর্গঠন, এককালীন পরিশোধসহ বিভিন্ন নীতিগত সুবিধার মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাদের নিয়মিত ঋণ পরিশোধে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে নতুন অধ্যায়
সংস্কার কার্যক্রমে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি এসেছে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে। পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠন করা হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি।
নতুন ব্যাংকটি সেপ্টেম্বর থেকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে। একই সঙ্গে নতুন আমানতও আসছে। ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমানত উত্তোলনের জন্য ৭৪ হাজার ২২১টি আবেদন জমা পড়ে, যার পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা।
একীভূত ব্যাংকগুলোর অনিয়ম, ঋণ বিতরণ ও অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ফরেনসিক অডিট চলছে। খেলাপি ঋণ আদায়েও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বাসসের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যাংকটি প্রায় ১০ হাজার মামলা করেছে।
পুরোনো নিয়ন্ত্রণ ফেরার সুযোগ বন্ধ
সংকটে পড়া ব্যাংকের সাবেক মালিক বা নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীর বিশেষ ব্যবস্থায় আবার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর সংসদে সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে আইনের ১৮(ক) ধারা বাতিল করা হয়।
এর ফলে ব্যাংক পুনর্গঠনে মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার কাঠামো আরও স্পষ্ট হয়েছে। তবে আইনি পরিবর্তনের পাশাপাশি সংস্কারের কার্যকারিতা নির্ভর করবে ঋণ আদায়, সম্পদ পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর।
ঋণপ্রবাহে ধীরে গতি
ব্যাংক খাতের সংকটের মধ্যেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে সামান্য গতি ফিরেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। জুনে এ হার ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে তারল্যের সংকট নেই। ফলে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়াতে ঋণপ্রবাহ আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
আমানতে বাড়ছে স্বস্তি
জুন শেষে ব্যাংক খাতের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। মার্চের তুলনায় তিন মাসে আমানত বেড়েছে ৫২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
উপশাখাগুলোতেও আমানত বেড়েছে। মার্চ থেকে জুন সময়ে উপশাখায় আমানত ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৮৪ হাজার ২৬৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে একই সময়ে উপশাখাগুলোর ঋণের স্থিতি কমেছে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে নতুন কেপিআই কাঠামো চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১৩ সেপ্টেম্বর জারি করা নির্দেশনায় নির্দিষ্ট সূচকের ভিত্তিতে এমডি-সিইওদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করা, পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব স্পষ্ট করা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
আমানত সুরক্ষায় পরিবর্তন
ব্যাংক ব্যর্থ হলে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা বাড়াতে নতুন আমানত সুরক্ষা আইনে সুরক্ষিত আমানতের সর্বোচ্চ সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে।
পাশাপাশি ব্যাংক রেজল্যুশন ব্যবস্থার মাধ্যমে দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, একীভূতকরণ বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা আরও সুসংহত করা হয়েছে।
প্রযুক্তি ও তদারকিতে বিনিয়োগ
ব্যাংকিং খাতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নিরাপত্তা বাড়াতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর্থিক খাতের নিরাপত্তা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং সংস্কার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য ১ হাজার ২৭৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার কারিগরি সহায়তা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলা কিউআর লেনদেন সম্প্রসারণ, ই-পেমেন্ট ক্রেডিট সুবিধা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, বাসেল-৩ তারল্য অনুপাত এবং ঋণ পুনর্গঠন নিয়েও নতুন নির্দেশনা এসেছে।
সামনে বাস্তবায়নের পরীক্ষা
ব্যাংক খাতে এখন একসঙ্গে চলছে দুর্বল প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, ঋণ আদায়, ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি এবং আমানত সুরক্ষা জোরদারের কাজ। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংক খাতকে আরও স্থিতিশীল ও আস্থাভিত্তিক কাঠামোয় নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তবে সংস্কারের প্রকৃত ফল বোঝা যাবে বাস্তব প্রয়োগে। খেলাপি ঋণ আদায়, ব্যাংকের সম্পদের মান উন্নয়ন, আমানতকারীর আস্থা বৃদ্ধি, মূলধন শক্তিশালীকরণ এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ—এই সূচকগুলোই আগামী দিনে সংস্কারের অগ্রগতি বোঝার প্রধান ভিত্তি হবে।