| ঢাকা, বাংলাদেশ | মঙ্গলবার, ৪ অক্টোবর ২০২২ |
1663211019.jpg 1647622201.jpg

বিভাগ : অর্থ-বাণিজ্য তারিখ : ১৭-০৮-২০২২

বাংলাদেশ কি রাশিয়া থেকে তেল কিনতে পারবে?


  ভয়েস এশিয়ান ডেস্ক


ভয়েস এশিয়ান, ১৭ আগস্ট, ২০২২।। রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কেনার ‍উপায় খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় মঙ্গলবার তিনি এ নির্দেশ দেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতসহ অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও রাশিয়া থেকে সস্তায় জ্বালানি তেল কিনতে পারে। অনেক পথও আছে, তবে সমস্যা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সবচেয়ে বড় অর্থনীতির এই দেশটিকে ‘না চটিয়ে’ রাশিয়া থেকে তেল কেনার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন অখুশি হলে এই দুই বড় বাজারে বাংলাদেশের ৩৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি হুমকিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে তারা বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানি না করলে বা কমিয়ে দিলে দেশ বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে।

বেশ কিছুদিন ধরেই রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। গত মে মাসে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদও এমন ইঙ্গিত দেন। তবে কীভাবে আমদানি হবে, দাম কীভাবে পরিশোধ করা হবে- সে বিষয়ে কোনো উপায় নির্ধারণ হয়নি।

একনেক সভা শেষে মঙ্গলবার পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, ‘বৈঠকে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারত যদি রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করতে পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না?”

রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানি করা গেলে বিনিময় মুদ্রা কী হবে তা নিয়ে, সে বিষয়েও একটি সমাধান খুঁজে বের করতে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান মান্নান।

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের পরে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ রাশিয়া আগে প্রতিদিন প্রায় ৫ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করত, যার অর্ধেকের বেশি যেত ইউরোপে। ।

গত ফেব্রুয়ারিতে রুশ বাহিনী ইউক্রেনে অভিযান শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা একের পর এক মস্কোর ওপর অবরোধ আরোপ শুরু করে।

এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তেলের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নও জ্বালানির জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার ঘোষণা দেয়।

নিষেধাজ্ঞার মুখে অন্য ক্রেতারা রুশ তেল কেনা থেকে পিছু হটলেও বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ তেল আমদানিকারক ও ভোক্তা দেশ ভারত সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যাপক মূল্য ছাড়ে তাৎক্ষণিক টেন্ডারের মাধ্যমে রাশিয়া থেকে বাড়তি তেল কেনা শুরু করে। চীনও রাশিয়া থেকে তেল কেনা বাড়িয়েছে বলে খবর এসেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে।

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে কূটনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে রাশিয়া থেকে ভারতের অতিরিক্ত তেল কেনার বিষয়টি ভালোভাবে না নেয়ার বিষয়টি এরই মধ্যে স্পষ্ট করেছে ওয়াশিংটন।

রাশিয়ার পণ্য কেনার ক্ষেত্রে দাম পরিশোধ নিয়েও জটিলতা রয়েছে। সুইফটে নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারে দাম পরিশোধ সম্ভব নয়। আর রাশিয়াও অনেক দেশের ক্ষেত্রে রুবলে দাম পরিশোধের শর্ত দিচ্ছে।

যুদ্ধ শুরুর পর পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলে ১৩০ ডলার ছাড়িয়ে গেলেও এখন তা অনেকটা কমে এসেছে। কিন্তু তেল আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভর্তুকি কমাতে আর ডলার বাঁচাতে সরকার অগাস্টের শুরুতে জ্বালানি তেলের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে, যার প্রভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে অনেকটা।

তেল বাঁচাতে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমিয়ে দিয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে রুটিন করে সব এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

এ অবস্থায় রাশিয়া থেকে তেল কেনা হলে অনেক কম দামে পাওয়া যাবে বলে বাংলাদেশ সরকার আশা করছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে যে দামে তেল কেনে ভারত, তার তুলনায় ব্যারেল প্রতি প্রায় ২০ ডলার বা তারও বেশি ছাড় দিচ্ছে রাশিয়া৷ তাই ভারত এখন যে সব দেশ থেকে তেল কেনে সেই তালিকায় দুই নম্বরে উঠে গেছে রাশিয়া৷ আগে সৌদি আরব ছিল দুই নম্বরে৷ এখন তারা তিন নম্বরে আছে৷ এক নম্বরে আগের মতোই ইরাক আছে৷

বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে তেল কিনলে মূল্য পরিশোধ করা যাবে কীভাবে-এ প্রশ্নের উত্তরে অর্থনীতির গবেষক বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘তিন ভাবে দাম পরিশোধ করা যেতে পারে। প্রথমত, আমরা এখন রাশিয়ায় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের মতো পণ্য রপ্তানি করে থাকি। আমরা যে তেল কিনব সেই দাম রপ্তানি থেকে যে আয় হবে তা দিয়ে একটা সমন্বয় করা যেতে পারে।

’দ্বিতীয়ত-আমাদের রূপপুর পারমণবিক বিদুৎ কেন্দ্রের জন্য বড় ধরনের কেনাকাটা করতে হচ্ছে, সেই কেনাকাটার বিলের সঙ্গে তেল আমদানির বিল সমন্বয় করা যেতে পারে। আর শেষেরটি হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া সম্মতি দিলে ডলারেও পেমেন্ট করা যেতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘রাশিয়ার থেকে তেল আমদানির বিল পরিশোধ করা কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা হচ্ছে আমরা রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করব কিনা? এটা একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। রাশিয়া থেকে তেল কিনলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি বিরাগভাজন হয়, তাহলে এই পথে যাওয়া ঠিক হবে না।

’কেননা, এই দুই বড় বাজারে বাংলাদেশের ৩৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি। রাশিয়া থেকে তেল কেনা শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো যদি নাখোশ হয়, তারা বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানি না করে বা কমিয়ে দেয় তাহলে বাংলাদেশ বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে।’

এক হিসাব দিয়ে আহসান মনসুর বলেন, ‘রাশিয়া থেকে কম দামে তেল কিনলে হয়তো আমাদের ৩০-৪০ কোটি ডলারের মতো সাশ্রয় হবে। কিন্তু রাশিয়া-ইউরোপ অখুশি হলে ৩৫-৪০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

‘তাই আমি মনে করি, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তাড়াহুড়া না করে ভেবে-চিন্তে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সব দিক বিবেচনায় রাখতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা কিন্তু ভারতের মতো বড় দেশ নই। যুক্তরাষ্ট্র অনেক কিছুতে ভারতের ওপর নির্ভরশীল। ভারতের অনেক বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানি আছে। যাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নির্ভর করে।

‘কিন্তু আমাদের কিন্তু সে রকম অবস্থা নেই। আমরা ছোট দেশ, ছোট অর্থনীতি। যে অর্থনীতির অনেক কিছুই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। তাই এই দুই দেশ নাখোশ হয়, এমন সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হবে না।

‘যুক্তরাষ্ট্র যদি নিরব থাকলে আমরা ভারতের মতো রাশিয়া থেকে তেল কিনতে পারি, কিন্তু তারা চটে গেলে দুদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। সেই ঝুঁকি আমরা নেব কিনা-সেটাই এখন বড় বিষয়। মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র চটলে, ইইউও চটবে।’

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময় (কারেন্সি সোয়াপ) নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। রাশিয়া, চীন ও ভারত—এই তিন দেশের সঙ্গে এমন হতে পারে। আমরা এসব দেশ থেকে আমদানি বেশি করি। তাহলে তারা আমাদের টাকা কী করবে? এ নিয়ে কী করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘রাশিয়ার আর্থিক লেনদেনের ওপর চলমান নিষেধাজ্ঞার কারণে সুইফট সিস্টেমের বাইরে গিয়ে চীনের মুদ্রা বা টাকা ও রুবলে লেনদেনের বিষয়টি নিয়ে ঢাকা ও মস্কো ভাবছে। এটা সম্ভব। রাশিয়ায় আমাদের যে ১ বিলিয়ন ডলারের মতো রপ্তানি হয়, সেই রপ্তানি বিল রাশিয়ার মুদ্রা রূবলে নিলে, সেই রুবল দিয়ে আমরা তেলের দাম শোধ করতে পারি। আবার ডলার বা টাকা দিয়ে চীনের মুদ্রা ইউয়ান কিনে সেই ইউয়ান দিয়েও তেলের দাম পরিশোধ করা যেতে পারে।’

দেশের আরেক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ভারত রাশিয়া থেকে রুবলে তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। সেটা সম্ভব হলে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজও রুবল-টাকায় হওয়া সম্ভব।

‘তবে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, সরকার টু সরকার বাণিজ্য হলে সেটা রুবল-টাকাতে হওয়ায় খুব একটা সমস্যা নেই। কিন্তু বেসরকারি পর্যায়ে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সমস্যা হবে। কেননা, বেসরকারি উদ্যোক্তারা টাকা দিয়ে যেমন সহজেই ডলার কিনতে পারেন; রুবল তো সেভাবে পাবেন না।’

ভারতের রাষ্ট্রীয় তেল পরিশোধনকারী সংস্থা হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (এইচপিসিএল) সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের এপ্রিল-মে মাসে রাশিয়া থেকে মাত্র ৪৪ কোটি ১০ লাখ ডলারের তেল কিনেছিল ভারত৷ আর চলতি ২০২২ সালের শুধু মে মাসেই ১৯০ কোটি ডলারের তেল কিনেছে ভারত৷

আগে বছরে চাহিদার মোট ২ শতাংশ রাশিয়া থেকে আমদানি করত ভারত। এবার এপ্রিল-মে মাসে চাহিদার ১০ শতাংশ তেল রাশিয়া থেকে আমদানি করেছে। যত সময় গড়াচ্ছে, ততই রাশিয়া থেকে তেল আনার পরিমাণও বাড়ছে৷ কারণ রাশিয়া সস্তায় তেল দিচ্ছে ভারতকে।

কিছুদিন আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন ভারত সফরে গিয়ে বাংলাদেশও যাতে ভারতের মতো সস্তায় রাশিয়া থেকে তেল কিনতে পারে, সেই রাস্তা বাতলে দিতে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে অনুরোধ করেছিলেন।

দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা আহসান মনসুর বলেন, ‘ইউরোপ-অ্যামেরিকার চোখরাঙানিকে ভারত ভয় না পেয়ে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তার কারণ হলো- আয়তনে ও প্রভাবে ভারত অনেকটাই বড়৷ ভারতের বিশাল বাজার ধরতে সব দেশের কোম্পানি উদগ্রীব৷ ভারতের বাজার হারালে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি রীতিমতো বিপাকে পড়বে৷’

‘অস্ত্র থেকে শুরু করে ভোগ্যপণ্য- সবকিছুর ক্ষেত্রেই ভারতের বাজার তাদের কাছে খুবই লোভনীয়৷ সেজন্য ভারত এই চাপকে উপেক্ষা করতে পারে।’

‘কিন্তু বাংলাদেশ পারে না, এটাই বাস্তব সত্য,’ বলেন আহসান মনসুর।

 





 

অর্থ-বাণিজ্য

সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১৪ টাকা কমল

দেশে দুই মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ৪৭ হাজার কোটি টাকার

বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিতে চীন-ভিয়েতনামের চেয়ে এগিয়ে

৭ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন রেমিট্যান্স সেপ্টেম্বরে

১২ কেজি এলপিজির দাম কমল ৩৫ টাকা

কারওয়ান বাজার পেরোলেই সবজির দাম দ্বিগুণ

দুর্গাপূজায় ৪ দিন বেনাপোল বন্দরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ

রাজধানীর বেশির ভাগ বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না খোলা চিনি

বাংলাদেশে ৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে তুরস্ক

মালয়েশিয়ার সঙ্গে দ্রুত এফটিএ করতে আগ্রহী বাংলাদেশ : অর্থমন্ত্রী

অর্থ-বাণিজ্য বিভাগের আরো খবর


1585646778.gif 1585646793.jpg 1585646805.gif

1615174445.gif

1660642186.jpg




Copyright © 2017-2022   |   Voice Asian - Asian Based News Portal
Contact: voiceasianinfo@gmail.com

   
StatCOUNTER